Beta

নওগাঁয় দুর্যোগ সহনীয় ২১১ বাড়ি নির্মাণ

২৮ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৪৮ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০১৯, ১৯:০৪

নওগাঁর সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের দুর্যোগ সহনীয় একটি বাড়ি। ছবি : এনটিভি

নওগাঁয় প্রথমবারের মতো দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি নির্মাণ করছে সরকার। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির বিশেষ খাতের অর্থে মানবিক সহায়তায় নওগাঁর ১১ উপজেলার অসচ্ছল, হতদরিদ্র, ঘরহীন, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন দুর্যোগে গৃহহীন পরিবার, বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারসহ ২১১টি পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে।

এসব অসচ্ছল পরিবারের নিজস্ব তিন শতক জমিতে ঘরগুলো নির্মাণ হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রত্যেকটি বাড়ি নির্মাণে সরকারের খরচ হচ্ছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে দুর্যোগ প্রতিরোধী বাড়িগুলো নির্মাণ করছে সরকার।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন নওগাঁ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি আরো জানান, নওগাঁ সদর উপজেলায় ২০টি, পোরশা উপজেলায় ২৪টি, সাপাহার উপজেলায় ২৩টি, নিয়ামতপুর উপজেলায় ২২টি, পত্নীতলা উপজেলায় ২১টি, ধামইরহাট উপজেলায় ১৯টি, বদলগাছী উপজেলায় ১৭টি, মহাদেবপুর উপজেলায় ১৮টি, মান্দা উপজেলায় ১৭টি, রাণীনগর উপজেলায় ১৫টি ও আত্রাই উপজেলায় ১৫টিসহ সর্বমোট ২১১টি বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে।

ইটের গাঁথুনি দিয়ে বাড়িগুলো নির্মিত হচ্ছে। কাঠের দরজা-জানালা, অত্যাধুনিক রঙিন টিনের ছাউনি, ১০ ফিট লম্বা ও ১০ ফিট আয়তনের দুই কক্ষের বাড়ি, একটি রান্নাঘর ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি শৌচাগার করা হবে।

মান্দার গণেশপুর ইউনিয়নের বাঙ্গালপাড়ার আবদুল গফুর সরদার (৬০), রানীনগরের মিরাট ইউনিয়নের হরিষপুর গ্রামের লতিফুল বেওয়া (৬৫) ও আতাইকুলা গ্রামের আম্বিয়া বেওয়া (৬৫) ও খট্টেশ্বর ইউনিয়নের পশ্চিম বালুভরা গ্রামের ফরিদা বিবি (৫২) দুর্যোগ সহনীয় ঘর পাচ্ছেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন। তাঁদের নিজস্ব তিন শতক জমিতে সরকার ঘর করে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁরা জানান, কোনো দিন পাকা ঘরে থাকার স্বপ্নও দেখেননি তাঁরা। তাঁদের সামান্য জমিতে সরকার ঘর করে দেওয়ায় স্থায়ী আশ্রয় পাচ্ছেন।  

পোরশা সদরের নিতপুর গ্রামের ছিন্নমূল বাদাম বিক্রেতা ফিটি (৭০) বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী কুড়িয়ে বিক্রি করা সামান্য টাকা আর বাদাম বিক্রি করে আমার দিন চলে। সংসারে আপন বলে কেউ নেই। টিনের ছাপড়ার নিচে বসবাস করছি। বৃষ্টিতে ভিজে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে কনকনে শীতে না ঘুমিয়ে জীবন পার করছি। পৈতৃক সূত্রে সামান্য জমি আছে। কিন্তু ঘর বানানোর সামর্থ্য নাই। সরকারি টাকায় পিআইও অফিস ঘর তৈরি করে দিচ্ছে। আমি ঘর পাচ্ছি। এটাই আমার কাছে হবে রাজপ্রাসাদ। সরকারি সহযোগিতায় নতুন বাড়িতে জীবনের শেষ সময়ে যে কয়টা দিন বেঁচে থাকব, ভালো থাকব।’

নওগাঁর মান্দা উপজেলার গণেশপুর ইউনিয়নের বাঙ্গালপাড়ার দুর্যোগ সহনীয় একটি বাড়ি। ছবি : এনটিভি

সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের নামানুরপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী আলেয়া বেওয়া (৫০) বলেন, ‘নিজের সামান্য জমি থাকলেও ঘর বানানোর সামর্থ্য নাই। বেঁচে আছি প্রতিবন্ধী ভাতা আর গ্রামের মানুষের সাহায্য নিয়ে। জন্ম থেকেই ঝুপড়ির মধ্যে বসবাস করছি। সরকারি খরচে দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি পাওয়ার শেষ জীবনটা হবে সুখের, নতুন বাড়িতে ভালোভাবে থাকতে পারব।’

একই ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের ভিক্ষুক আব্দুল জব্বার (৭৫) বলেন, ‘অনেকদিন আশ্রয়হীন ছিলাম, ভিক্ষা করে দিন কাটত। ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বৃদ্ধ হয়েছি। বয়সের কারণে এখন আর চলতে পারি না। মানুষের দয়া আর দানের ওপর বেঁচে আছি। সরকারের সহায়তা আমার সামান্য জমিতে নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। শেষ বয়সে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভালোভাবে দিন কাটাতে পারব।’

এদিকে, নওগাঁ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নে নওগাঁ জেলার ১১ উপজেলায় ২১১টি পরিবারের মধ্যে দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি করে দিচ্ছে সরকার। যার ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শুরু হয়েছিল। যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৪১ টাকা। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও রান্নাঘর সুবিধাসহ এসব বাড়ি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত প্রতিরোধে সক্ষম। কোনো মানুষ যেন বাস্তুহারা না থাকে সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।’

এ বিষয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. হারুণ অর রশিদ বলেন, ‘হতদরিদ্রদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিনব ও চমৎকার একটি কর্মসূচি। দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের জন্য এবং হতদরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার এ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন করা।’

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সম্মিলিতভাবে এ কর্মসূচি সফল করতে কাজ করছে। নির্মাণকাজ শেষের দিকে। শিগগিরই বাড়ি হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

Advertisement