Beta

ডেঙ্গু জ্বর ও রক্ত রোগের সম্পর্ক কী?

০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:১৪

ফিচার ডেস্ক
ডেঙ্গুর সঙ্গে রক্তস্বল্পতার সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. মো. সালাহ উদ্দিন শাহ্ ও ডা. সানজিদা হোসেন। ছবি : এনটিভি

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে রক্ত রোগের সম্পর্ক নিবিড়। ডেঙ্গু জ্বর ও রক্তরোগের সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেছেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সালাহ উদ্দিন শাহ্।

বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হেমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩৫৩২তম পর্বে সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়।

প্রশ্ন : ডেঙ্গু জ্বর ও রক্ত রোগের কী সম্পর্ক রয়েছে?

উত্তর : আমি প্রথমেই আতঙ্ক শব্দটা বাদ দিতে চাই। আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এই সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের কারণে অনেক মানুষ আমাদের দেশে মারা যাচ্ছে। এমনকি যাঁরা ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা করেন, চিকিৎসক তাঁরাও অনেকে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। কাজেই এটা নিয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

এরই মধ্যে সারা দেশে আমাদের সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়েও ডেঙ্গু জ্বরের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে। সেগুলোর মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আমরা কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণেও নিয়ে এসেছি। মৃত্যুর হারও অনেক কমে গেছে। তবে মাঝেমধ্যে বেড়ে যাচ্ছে, আবার মাঝেমধ্যে কমে যাচ্ছে, এমনই একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছি।

আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে হেমাটোলজি বিভাগে রয়েছি। আমরা আমাদের বিভাগেও ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার সেল খুলেছি। সেখানে শুরুতে আজ থেকে প্রায় ১৫/২০ দিন আগে যে সংখ্যক রোগী আসত, ঈদের আগে, ঈদের পরে কিন্তু সেই সংখ্যক রোগী আসতে আসতে কমে গেছে। আমরা সমস্ত ডেঙ্গু রোগীকে আমাদের ইউনিটের সুস্থ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।

আসলে জ্বর হলে প্রথম দুশ্চিন্তা হয় যে ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে কি না। ডেঙ্গু জ্বর যখন শনাক্ত হয়, আরেকটি দুশ্চিন্তা কাজ করে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলো কি না। সাধারণ মানুষ এখন সবাই সচেতন। তারা জিজ্ঞেস করে ব্লাডপ্রেশার কমে গেল কি না। আবার অনেকে বলে প্লাটিলেটটা কমে গেল কি না। আমরা জানি, ডেঙ্গু জ্বর হলে তীব্র শরীর ব্যথা, অন্যান্য উপসর্গ তিন থেকে পাঁচ দিন থাকে। সর্বোচ্চ তিন দিন, কখনো পাঁচ দিন, কখনো ছয় থেকে সাত দিন থাকে। এরপর যখন জ্বর কমে যায়, তখনই কিন্তু আরো ভালোভাবে ফলোআপ দিই।

আমরা ছোটবেলা থেকে একটি জিনিস জেনে এসেছি, যখন তীব্র জ্বর থাকে, শরীর ব্যথা থাকে, শারীরিক অসুস্থতা থাকে, তখনই আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হই। জ্বর কমে গেলে তো আমরা খুশি হয়ে যাই। কিন্তু ডেঙ্গু এমনই একটি চোরাবালুর মতো রোগ, যখন আমরা ভাবব, ভালো হয়ে গেছে, সেই সময়টাতেই এই জটিলতাগুলো দেখা দিচ্ছে। এর আগে ২০০০ সালে যখন ডেঙ্গু হয়েছিল, এর পর আমরা এটি নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু এতো ব্যাপক হারে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হওয়া, প্লাটিলেট কমে গিয়ে, এ রকম বড় বড় দুর্ঘটনা সে সময়ে হয়নি। এর জন্য আমরা সবাই বলছি, ডেঙ্গু জ্বরের যে ভাইরাস, তার গতি-প্রকৃতি, চরিত্র পাল্টে গেছে। তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো তীব্র হচ্ছে, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হচ্ছে, প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। আগে যাদের লক্ষণ ছিল, তাদের নতুন করে ডেঙ্গু হওয়ার পরে শারীরিক অসুস্থতাগুলো তীব্র আকার ধারণ করছে। তো, আমি এতটুকু বলব, ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার পরে যদি ঠিক নিয়মিতভাবে তার পরিচর্যা করা হয়, ফলোআপ করা হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ে আমি আতঙ্ক তো বলবই না, দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। আমরা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা করতে পারব।

আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ডেঙ্গু জ্বর ও রক্ত রোগের সম্পর্ক কী? আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু জ্বর পজিটিভ হচ্ছে, পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া। অর্থাৎ রক্তস্বল্পতা। অস্থিমজ্জা থেকে রক্ত তৈরি না জাতীয় হওয়া রোগ। আবার ব্লাড ক্যানসারেরও অনেক রোগী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। আইটিপি নামে একটি রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও প্লাটিলেট এমনিতেই কম থাকে। তারাও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে রক্ত রোগও ধরা পড়ছে।

এর মধ্যে দেখা যায়, কখনো কখনো হিমোগ্লোবিন খুব কম থাকে, কখনো কখনো ডব্লিউবিসি বা শ্বেত রক্তকণিকা বেশি থাকে। আবার কখনো কখনো প্লাটিলেট কম থাকে। যখন হিমোগ্লোবিন খুব কম থাকে, আমরা চিন্তা করি, তার রক্তস্বল্পতা হচ্ছে। তো রক্তস্বল্পতার কারণ তো বুঝতে হয়। অনেকে ভাবছে, ডেঙ্গুর কারণে রক্তস্বল্পতা হচ্ছে। কিন্তু সব সময় ডেঙ্গুর কারণে হয় না। আপনারা দেখেন যে ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার পর রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ তিন থেকে পাঁচ দিন পরে জ্বর থাকে না। ডেঙ্গুর কারণে বিভিন্ন সমস্যা হয়। এর জন্য শরীরের রক্তের মধ্যে যে জলীয় অংশ থাকে, সেটি রক্তনালির বাইরে চলে আসে, টিস্যুতে চলে আসে। যেমন পেটের মধ্যে চলে আসতে পারে, ফুসফুসের মধ্যে চলে আসতে পারে। ফুসফুসের চারদিকে একটি চিমনি থাকে প্লুরা বলে, এখানেও জমতে পারে। কখনো কখনো হার্টের চারদিকে জমতে পারে। এই পানিগুলোতে শরীর ফুলে যায়। এই পানিগুলো যখন চলে যায়, তখন রক্তচাপ কমে যায়। রক্তচাপ কমে যেতে যেতেই আসলে রোগী শকে চলে যায়। শকে যাওয়ার পর শারীরিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেটি শকের লক্ষণ। একে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলে। পাশাপাশি দেখা যায়, ওই সময় প্লাটিলেট কমে যেতে পারে, আবার লাল রক্ত বেড়ে যেতে পারে। এখন ডেঙ্গু জ্বর হলে রক্তের স্বল্পতার চেয়ে আমরা যেই ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, সেটি হলো রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া। এ অবস্থায় যদি কারো রক্তশূন্যতা দেখা দেয়, হিমোগ্লোবিন কম থাকে, তাহলে বুঝতে হবে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

তখন আমরা দেখি, আমাদের যারা সাধারণ মানুষ, তারা জানে যে রক্তস্বল্পতা হলে আয়রন জাতীয় খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। আয়রন খেতে হবে। মাঝেমধ্যে কখনো কখনো ব্লাড ট্রান্সফিউশন করা হয়। আমাদের পরামর্শ থাকবে, আমাদের যাঁরা চিকিৎসক রয়েছেন, তাঁদের কাছেও থাকবে এবং যাঁরা সাধারণ মানুষ চিকিৎসক নন, তাঁদের কাছেও থাকবে যখন হিমোগ্লোবিন কমে যাবে, রক্তস্বল্পতা দেখা দেবে, সঙ্গে সঙ্গে আয়রন ট্যাবলেট না খেয়ে, রক্ত না নিয়ে আপনি এর কারণ খুঁজুন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে সঠিকভাবে তার চিকিৎসাটা পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন : ডেঙ্গু রোগীর যখন এই ধরনের রক্তস্বল্পতার সমস্যা হয়, তখন তো ডেঙ্গুর চিকিৎসা করার সময় বাড়তি সচেতনতার প্রয়োজন হয়। সেগুলো আসলে কী কী?

উত্তর : যদি রক্ত রোগীর ডেঙ্গু রোগ হয়, রক্ত রোগেরও চিকিৎসা করতে হবে, ডেঙ্গু জ্বরেরও চিকিৎসা করতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কী? যাতে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম না হয়, সে ক্ষেত্রে আমরা তার শরীরে স্যালাইন দিয়ে থাকি। স্বাভাবিক স্যালাইন দিয়ে থাকি। যদি ডায়রিয়া হয়, কলেরা স্যালাইন দিই। ব্লাডপ্রেশার যদি অনেক নেমে যায়, অর্থাৎ যদি দেখা যায় রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে আসে, তখন আমরা স্যালাইনের পাশাপাশি প্লাজমা এক্সপ্যান্ডারও দিয়ে থাকি।

প্রশ্ন : ডেঙ্গু রোগীর রক্তস্বল্পতা হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন?

উত্তর : যখন স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে হিমোগ্লোবিন অনেকটা কমে যাবে, তখন আমরা হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার কারণ খোঁজা শুরু করি। তার শরীরের অন্যান্য উপাদান ঠিক রয়েছে কি না, দেখার চেষ্টা করি। পাশাপাশি দেখে নিই, তার শরীরের অস্থিমজ্জা থেকে রক্ত উৎপন্ন হচ্ছে কি না। পাশাপাশি দেখা যায়, লিম্ফোমাসহ অনেক রোগ রয়েছে। যদি অস্থিমজ্জা থেকে স্বাভাবিক যেভাবে রক্ত তৈরি হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াটা ব্যাহত হয়, খারাপ কোষগুলো, সেই জায়গাটা দখল করে ফেলে। আমরা হিমোগ্লোবিনের পাশাপাশি প্যারিফেরাল ব্লাড টেস্ট যদি করি, তাহলে কী ধরনের রক্তশূন্যতা হতে পারে, সেটি দেখা যায়। ডেঙ্গু জ্বরে আমরা কী চিন্তা করি? হিমোগ্লোবিন কমার চেয়ে আমরা চিন্তা করি প্লাটিলেট কমে গেছে। প্লাটিলেট অন্য রোগেও কমে যায়।

শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী ও রক্ত রোগীদের যদি ডেঙ্গু হয়, তাদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তাকে সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিভাবে চিকিৎসা নিতে হবে। তাহলে আমরা জটিলতাগুলো এড়িয়ে যেতে পারব। মূল রোগেরও চিকিৎসা হবে, ডেঙ্গু রোগেরও চিকিৎসা হবে।

Advertisement