Beta

মেনোপজ হওয়ার পরও ঋতুস্রাব : কারণ, জটিলতা ও করণীয়

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:২৫

ফিচার ডেস্ক
মেনোপজ হওয়ার পরও ঋতুস্রাবের সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করেছেন ডা. শামীমা নার্গিস নীলা ও ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

অনেকের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা দীর্ঘমেয়াদি ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও হঠাৎ করে ঋতুস্রাব হতে পারে। একে বলা হয় পোস্ট মেনোপজাল ব্লিডিং। এটি কেন হয়, জটিলতা কী এবং করণীয় কী?

এ বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩৫৩৭তম পর্বে কথা বলেছেন ডা. শামীমা নার্গিস নীলা। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের পরামর্শক হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : একজন নারীর হয়তো একেবারে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে। তবে হঠাৎ করে সে দেখল আবারও ঋতুস্রাব শুরু হয়েছে। এটা কি হতে পারে?

উত্তর : অবশ্যই হতে পারে। একে আমাদের ভাষায় আমরা বলি পোস্ট মেনোপোজাল ব্লিডিং। আপনি বলেছেন, এটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দেশে আমরা বলি, ৪৫ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। প্রায় ৫০ বছর বয়সে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। বন্ধ হয়তো এক বছর পর্যন্ত রয়েছে, এরপর তার হয়তো ব্লিডিং হচ্ছে। এই সমস্যা নিয়ে রোগীরা আমাদের কাছে আসে। এর কিছু কারণ রয়েছে।

প্রশ্ন : কারণগুলো কী?

উত্তর : কিছু রয়েছে বেনাইন। এটি খুব একটা ভয়ংকর কিছু নয়। ম্যালিগন্যান্সিও এর কারণের মধ্যে চলে আসে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব বন্ধের পরে আমরা তাদের হরমোন দিই। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হিসেবে। ইসট্রোজেন টেবলেট দিই। এদের ক্ষেত্রে দেখা যায় এই ওষুধটা খেলে রক্তপাতটা হয়। তো, এ রকম একটি ইতিহাস নিয়ে অনেকে আমাদের কাছে আসেন।

এ ছাড়া অনেক রোগীর দেখা যায়, অ্যাট্রোফিক অ্যান্ড্রোমেট্রাইটিস, অ্যাট্রোফিক ভেজাইনাটিস-এ ধরনের সমস্যাতেও আমাদের দেখা যায় যে রক্তপাত নিয়ে আসে। ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের যেহেতু ইসট্রোজেন হরমোন কমে যায়, এ জন্য জরায়ুর যে ভেতরের লাইনিংটা, আমরা অ্যান্ড্রোমেট্রিয়াম বলি, এর লেয়ারটা পাতলা হয়ে যায়। এতে এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাটা কমে যায়। তখন দেখা যায়, ঋতুস্রাবের রাস্তা দিয়ে অর্গানিজম ভেতরে ঢুকে সহজেই আক্রান্ত করে ফেলে। এই জন্য সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি। এরা আমাদের কাছে পোস্ট মেনোপজাল ব্লিডিং নিয়ে আসে।

কিছু ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যানসারজনিত অবস্থা থাকে, এটি জরায়ুতে হতে পারে, সার্ভিক্সে হতে পারে। ঋতুস্রাবের রাস্তা, ভেজাইনাতে হতে পারে। ক্যানসারজনিত কারণে ঋতুস্রাব বন্ধের পরেও রোগীরা রক্তক্ষরণ নিয়ে আমাদের কাছে আসে।

প্রশ্ন : এ ধরনের সমস্যা অবহেলা করলে কী ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর : যদি তার এক বছর ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে, যদি মেনোপজের পরে রক্তপাত হয়, তার পরিমাণ নয়, তার যদি এক ফোঁটা রক্তপাত, দুই ফোঁটা রক্তপাত হয়, একদিন বা দুদিন রক্তপাত হয়, তখনই তাকে আসতে হবে চিকিৎসকের কাছে। বের করতে হবে তার কারণটি কী। এটি একটি বেনাইন অবস্থা হতে পারে। খুব একটা ভয়ংকর কিছু নয়। আবার দেখা যায়, এই রক্তপাতের তিন ভাগের এক ভাগ থাকে ক্যানসার সম্পর্কিত। তিন ভাগের দুই ভাগই থাকে যে অবস্থাগুলো স্বাভাবিক বললাম সেগুলো। কিন্তু ওই এক ভাগও অবহেলা করা যাবে না। কত দিন কতবার এগুলোর প্রশ্নই ওঠে না। যদি সে দেখে এক বছর পরে তার রক্তপাত হচ্ছে, তখনই সে চিকিৎসকের কাছে আসবে।

প্রশ্ন : এ ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগীরা এলে আপনারা কী করেন?

উত্তর : যখন আমাদের কাছে রোগীরা আসে, ইতিহাস তো বড় একটি বিষয়। আমরা কিছু পরীক্ষাও করি। ইতিহাসে যেমন সে হরমোন নিচ্ছে কি না আমরা দেখে ফেললাম। তাহলে আমাদের মাথায় থাকল, এই কারণে এটি হতে পারে। যখন আমরা পরীক্ষা করবো, যে অঙ্গগুলো আমরা খালি চোখে, যন্ত্র দিয়ে দেখতে পারি, সেগুলো দেখব। যেমন, ভেজাইনাটা আমরা দেখতে পারি, জরায়ুর মুখটা আমরা দেখতে পারি। ওখানে কোনো সংক্রমণ রয়েছে কি না, কোনো পলিপ রয়েছে কি না, কোনো ম্যালিগন্যান্সির বিষয় রয়েছে কি না, আমরা কিন্তু দেখে ধারণা করতে পারি। তবে জরায়ুর ভেতর যেটি থাকে, সেটি কিন্তু আমরা ক্লিনিক্যালই বুঝব না। আমাদের তখন পরীক্ষায় যেতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ যেটা সেটা আমরা দিই। আলট্রাসনোগ্রাফই আমরা করতে বলি। আলট্রাসনোগ্রাফি আমাদের খুব সুন্দর একটি পথ নির্দেশ করে দিতে পারে।

আলট্রাসনোগ্রাফিতে আমরা দেখি ইউট্রাসের মাঝের যে লেয়ার, যাকে আমরা বলি অ্যান্ড্রোমেট্রিয়াম, ওটা কেমন, ওর পুরোত্ব কেমন, এটি নিয়মিত, নাকি অনিয়মিত। সুন্দর একটি ছবি আমাদের দিয়ে দেয়। এর মাপও রয়েছে। মেনোপজের পর অ্যান্ড্রোমেট্রিয়াল পুরোত্ব যদি চার মিলিমিটারের বেশি হয়, তবে অবশ্যই আমাকে এটা ম্যালিগন্যান্সি কি না এটা বের করতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে আমরা চলে যাবো। অ্যান্ড্রোমেট্রিয়াম থেকে টিস্যুটা নিয়ে আসি। টিস্যুটা এনে আমরা হিস্টোপ্যাথোলজি করি। এটা শেষ পরীক্ষা। তারা আমাদের বলে দিতে পারে এই অ্যান্ড্রোমেট্রিয়ামটা কেমন। কখনো কখনো দেখা যায় শুধুই হাইপার ফ্লাসিয়া। অর্থাৎ শুধুই মোটা হয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেকগুলো পর্যায় রয়েছে। যেমন একটু ফুলে গেছে। কোনো খারাপ কোষ নেই। অথবা ফুলে গেছে, একে বলি কমপ্লেক্স। এখানেও কোনো জটিলতা নেই। এরা খুবই ভালো দল। কেবল যদি হরমোন চিকিৎসা দিই, তাহলেই হয়। আর ফলোআপ অবশ্যই করতে হবে। ছয় মাস পর পর আমাকে ফলোআপ করতে হবে। রোগীর যদি উন্নতি হয়ে যায়, তাহলে কেবল ফলোআপে থাকলেই চলবে। আর কিছু করা লাগবে না। আবার দেখা যায়, সিম্পল কমপ্লেক্সের সঙ্গে, কিছু কিছু জটিল কোষ রয়েছে। তবে ম্যালিগন্যান্সি নয়। এদেরও আমরা হরমোন দিয়ে চিকিৎসা করতে পারি। তবে খুব ভালোভাবে ফলোআপ করতে হবে। লক্ষণগুলো কমে যেতে পারে। কোষও সাধারণ হয়ে যেতে পারে। আমরা সার্জারিতে যাব না, ফলোআপে রাখব। এটা একটু অস্থিতিশীল। একে আমরা বলি প্রি ম্যালিগন্যান্ট  অবস্থা। ম্যালিগন্যান্সি না আবার স্বাভাবিকও নয়। এদের ক্ষেত্রে যদি হরমোন দিয়ে দেখি উন্নতি হচ্ছে না, এদের আমরা সার্জারিতে চলে যাব। ফেলে রাখব না এদের। আর যদি ক্যানসারের বিষয়টি আসে, তাহলে আমরা আর কোনো ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করব না, অবশ্যই আমরা এর সার্জারিতে চলে যাব। পরে এখানে কেমোথেরাপি লাগতে পারে, রেডিওথেরাপি লাগতে পারে, সমন্বয় করে থেরাপিও লাগতে পারে।

Advertisement