নাক বন্ধ হলেই কি সাইনোসাইটিস?

সাইনাসের সমস্যা অনেকেরই হয়। কেবল কষ্টকর তা নয়, এটি বেশ বিরক্তিকর সমস্যাও বটে! আজ ১৮ ডিসেম্বর এনটিভির নিয়মিত আয়োজন ‘স্বাস্থ্য প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানের ২২৩৯তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সজল আশফাক।
প্রশ্ন : সাইনোসাইটিস এই কথাটার সঙ্গে আমাদের দর্শকরা মোটামুটি পরিচিত। তারপরও আপনি যদি একটু বুঝিয়ে বলেন সাইনোসাইটিস মানে কী এবং এই সাইনাস বা বায়ুকুঠুরির গুরুত্ব কী?
উত্তর : আসলে সাইনাস শব্দের অর্থ বাতাসভর্তি কিছু জায়গা বা কুঠুরি। আমাদের মস্তিষ্কের যে কুঠুরি আছে, এর মধ্যে অনেকগুলো বায়ুকুঠুরি রয়েছে। আমরা সাইনোসাইটিস বলতে যেই বিষয়টিকে বুঝে থাকি, সেটি হলো মেক্সিলারি সাইনোসাইটিস। মানে, চিবুক বরাবর যেই বায়ুকুঠুরি রয়েছে সেটিকেই আমরা সাধারণত বুঝে থাকি। আপনি ঠিকই বলেছেন যে সবাই খুবই পরিচিত এই শব্দটির সঙ্গে। তবে এই অতি পরিচিত শব্দের বিষয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকে বলে থাকেন, আমার সাইনাসের সমস্যা রয়েছে বা সাইনোসাইটিস রয়েছে। তবে দেখা যায় এদের অনেকের সাইনোসাইটিস নেই। আমাদের লোকদের মধ্যে একটি ধারণা হলো নাক বন্ধ থাকাই হয়তো সাইনোসাইটিস বা মাথাব্যথা হওয়া মানেই হয়তো সাইনোসাইটিস। সাইনোসাইটিস আসলে সেটি নয়। সাইনোসাইটিস কথার মধ্যেই এর অর্থ আছে। এই সাইনাসগুলোর মধ্যে বা এই বায়ুকুঠুরিগুলোর মধ্যে যদি কোনো ধরনের প্রদাহ হয়, সেটিই সাইনোসাইটিস। তার যেই আবরণ, ঝিল্লি রয়েছে সেখানে প্রদাহ হয়। এখন আসি সেই প্রদাহ সাধারণত কী কী কারণে হয়, সেটি নিয়ে। যেমন ধরেন অ্যালার্জিক রাইনাইটিস যদি কারো থাকে, কারো হাঁচি-সর্দি যদি অনেক বেশি হয় হঠাৎ করে সাইনোসাইটিস হতে পারে। হঠাৎ করে সাইনাসগুলো সংক্রমিত হয়ে যেতে পারে। এই সাইনাসের ভেতরে প্রতিনিয়ত যে শ্লেষ্মাগুলো জমে, সেগুলো নাক দিয়ে বের হয়। নাক যদি বন্ধ হয় সেই শ্লেষ্মাগুলো বের হতে পারে না। তাই নাক যদি বন্ধ হয়ে যায়, শ্লেষ্মাগুলো জমা পড়ে থাকে। বেশিক্ষণ যদি জমা পড়ে থাকে, সেখানে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধলে সেখানে সংক্রমণ হয়ে যায় এবং প্রদাহ হয়ে যায়। এটাই মূল কারণ। এটি অ্যালার্জির জন্য হতে পারে, হাঁচি-সর্দি বেশি থাকলে হতে পারে।
আরেকটি হতে পারে যাঁদের নাকের হাড় একটু বাঁকা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে। নাক দিয়ে তাঁরা সহজে বাতাস নিতে পারেন না। যেদিকটা বাঁকা সেদিকে এই সমস্যা হতে পারে। যেকোনো কারণে পথটা আংশিক বা পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এটিই সাধারণত সাইনোসাইটিস।
সাধারণত সাইনোসাইটিস রোগটি নির্ণয় করা খুব সহজ। একটি এক্সরে করেই বোঝা যায়। আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য সিটি স্ক্যান করা যায়। দেখা যায়, তার আবরণ মোটা হয়ে গেছে কি না বা কতটুকু জায়গাজুড়ে রয়েছে সেটা পুরোটাই বোঝা যায়।urgentPhoto
প্রশ্ন : সাইনোসাইটিস হলে বা সর্দি লাগলে আমাদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যায়। মানে, শব্দের যে শ্রুতি সেটি পরিবর্তন হয়ে যায়; নাকি সুর চলে আসে। এটার কারণ কী?
উত্তর : আপনি বলছিলেন বায়ুকুঠুরির কথা; এটি মাথার খুলির মধ্যে থাকে। এটার ভেতরে বাতাস থাকার কথা। এখন কোনো কারণে যদি আপনার নাক বন্ধ থাকে নাকি সুর হবে। কাজেই সাইনাসের যে কুঠুরিগুলো রয়েছে সেখানে যদি শ্লেষ্মা জমে থাকে, পুঁজ জমে থাকে, স্বাভাবিকভাবে সেগুলো ভরা থাকবে। এমন অবস্থায় থাকলে শব্দটা সুন্দর হবে না। বাতাস গিয়ে বের হতে পারছে না। একটু সংক্ষেপে বলি, একটি খালি কলস আপনি যদি বাইরে থেকে টোকা দেন সেটি এক ধরনের শব্দ করবে, পানি ভরে থাকলে সেটি সেই রকম শব্দ করবে না। প্রতিধ্বনিটা তেমনভাবে আসবে না। এ জন্য কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যায়।
প্রশ্ন : আরেকটি বিষয়, সাইনোসাইটিস হলে আমরা অনুভব করি, মাথার ওজন অনেক বেড়ে গেছে। এটা কেন?
উত্তর : খালি কলসের মধ্যে পানি থাকলে মাথা ভারী হবে। সাইনাসগুলোর মধ্যে যদি পুঁজ জমে থাকে, মাথাটা ভারী লাগবে এবং ব্যথা থাকবে। কারণ এখানে পুঁজ জমে আছে, ভারী হয়ে আছে, বন্ধ হয়ে আছে কিংবা শ্লেষ্মা জমে আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু দেরি হলে পুঁজও জমে থাকে। মাথাব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব, নাক বন্ধ থাকা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হওয়া, গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করা – এই সমস্যাগুলো থাকবে। এ রকম হলে ধরে নিতে হবে তার হয়তো বা সাইনোসাইটিস রয়েছে।
প্রশ্ন : সাইনোসাইটিসের সমস্যা হলে তার সমাধানটা কী? এ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কখন হয়, এটি ছাড়া আর কী চিকিৎসা রয়েছে?
উত্তর : অস্ত্রোপচার ছাড়াই বেশির ভাগ সাইনোসাইটিস চিকিৎসা করা যায়। রোগীদের যখন তীব্র অবস্থা হয়, যাকে বলি একিউট সাইনোসাইটিস, হঠাৎ করে হলো, সে ক্ষেত্রে ওষুধই একমাত্র চিকিৎসা। সাধারণত এই ক্ষেত্রে একটি ভালো অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়, যেটা সাইনাসের এই অঞ্চলে কাজ করে ভালো। আর একটি নাকের ড্রপ দিতে হয়, এই পথকে পরিষ্কার করার জন্য। ভেতরে যে শ্লেষ্মাগুলো আছে বা পুজ জমে থাকলে সেটাকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা পায় সে জন্য। অ্যান্টিহিসটামিন ওষুধ দিতে হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জি থেকে রোগী রক্ষা পায়। আর ব্যথা থাকলে এর ওষুধ দিতে হবে। আর অনেক সময় গরম পানির ভাপ নিতে হবে। এক লিটার গরম পানির মধ্যে একটু মেন্থল নিয়ে যদি বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে নিই, তাতে ওই সাইনাসের আশপাশের অঞ্চলগুলো একটু ময়েশ্চার হয়। একটু আর্দ্র হয়, সেখানের শ্লেষ্মাগুলো খুব সহজে বের হয়ে আসে। এই জিনিসগুলো প্রাথমিক অবস্থায় করলে অধিকাংশ একিউট সাইনোসাইটিস শুধু ওষুধ দিয়ে ভালো হয়ে যায়।
তবে কারো যদি বারবার হয়, তাহলে বায়ুকুঠুরিগুলোর মধ্যে যে ঝিল্লিগুলো থাকে, সেখানে স্থায়ী একটি পরিবর্তন হয়ে যায়। সেগুলো প্রদাহ হতে হতে মোটা হয়ে যায়। সেখানে কতগুলো সিলিয়া বা চুলের মতো জিনিস থাকে, যেগুলো সাইনাসের ভেতরে ঝাড়ুর মতো কাজ করে। বাইরে বের করে দেয় শ্লেষ্মাগুলোকে। ময়লা, ধুলোবালিকে বের করে দেয়। তখন সেগুলোর নড়াচড়া কমে যায়। সে আগের মতো আর সহজভাবে নড়াচড়া করতে পারে না। ঝাড়ু দেওয়া না হলে ময়লাটা কমে যায়, তখন দেখা যায় সমস্যা ক্রনিক হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রেও ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করার বিষয় রয়েছে। ওষুধ দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনমতো অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিসটামিন দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। যদি নাক বন্ধ থাকে, তাহলে এর জন্য স্টেরয়েড-জাতীয় স্প্রে রয়েছে, সেগুলো দিয়ে চিকিৎসা করার পরও অপেক্ষা করে দেখতে হবে। সাইনাসের এক্সরে করে দেখতে হবে বা সিটি স্ক্যান করে দেখতে হবে। অথবা সিটিস্ক্যান করে দেখতে হবে মাত্রাটা কতটুকু। যদি দেখা যায় সামান্য, তাহলে ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা করতে হয়। এটা অনেকদিন যদি চালিয়ে যায়, একটা সময় রোগী ভালো বোধ করে।
তবে অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা খুব তীব্র হয় এবং সারতে চায় না। ওষুধে তেমন কাজ করে না। আমরা সিটি স্ক্যানে দেখি বা এক্সরেতে দেখি একদম ঘোলা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করতে হয়।
প্রশ্ন : সাইনাসের অস্ত্রোপচারের সময় আগে কাটাছেঁড়া করতে হতো। এখন তো আপনারা অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে তেমন কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই অপারেশন করেন।
উত্তর : আগে একসময় ঠোঁটের নিচে ছিদ্র করে, সাইনাসের ভেতরে বিষয়গুলোকে বের করে নিয় আসত। এখন আর সেটা করা হয় না। এখন অ্যান্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি করা হয়। নাকের ভেতর দিয়ে ছোট্ট ক্যামেরার মতো সরু নল ঢুকিয়ে সাইনাসের ভেতরে ছোট্ট একটা ছিদ্র করে ভেতরটা পরিষ্কার করে নিয়ে আসা হয়। এতে দেখা যায়, রোগীর কাটাছেঁড়া তেমন হয় না। এর ফলাফলও অনেক ভালো।
প্রশ্ন: সাইনোসাইটিসের একটি লক্ষণ হলো মাথাব্যথা। তবে মাইগ্রেন, চোখ-অনেক কারণেই মাথাব্যথা হয়। তাই সাইনাসের কারণে মাথাব্যথা হলে বোঝার উপায় কী?
উত্তর : সাইনোসাইটিসের ক্ষেত্রে আমরা একটি এক্সরে করব। একটি সিটিস্ক্যান করে দেখব যে তার সাইনাসগুলো পরিষ্কার রয়েছে কি না। পরিষ্কার মানে হলো বাতাসগুলো ভর্তি আছে কি না। এক্সরেতে যদি দেখা যায় সাইনাসগুলো কালো হয়ে আছে, মানে বাতাস আছে, মানে ভালো। কালো মানে ভালো। যদি ঘোলা হয়ে থাকে সেটি ভালো নয়। তাহলে বুঝতে হবে সেখানে পুঁজ আছে বা অন্য শ্লেষ্মা জমে সেটা ভর্তি হয়ে আছে। কাজেই সাইনাসের কারণে মাথাব্যথা করছে কি না এটি বোঝার জন্য এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান করলেই যথেষ্ট। এর বেশি কিছু লাগে না।