প্রসূতি মায়ের জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা

গর্ভাবস্থা এমনিতেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। তবে এর মধ্যেও আরো কিছু বিশেষ জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩০৮৩তম পর্বে কথা বলেছেন ডা. রাশিদা বেগম। বর্তমানে তিনি ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রধান পরামর্শক হিসেবে কর্মরত।
প্রশ্ন : প্রসূতি মায়েদের অনেক রকম সমস্যা হয়। কিছু সমস্যা রয়েছে অতি সাধারণ। প্রথম গর্ভাবস্থায় তারা অনেক দুশ্চিন্তা বোধ করেন, যেগুলো বাড়িতেই সমাধানযোগ্য। এতে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। আবার কিছু সমস্যায় তারা আক্রান্ত হন, যার জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দরকার। জরুরি চিকিৎসা না হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। একজন প্রসূতি মায়ের বেলায় কী কী সমস্যা হতে পারে?
উত্তর : এখনো আমাদের দেশে এই বিষয়টা খুব অবহেলিত। প্রসূতি মায়ের যত্ন আলাদাভাবে নেওয়া উচিত। যেহেতু গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়, সেটার দ্রুত যদি ব্যবস্থা না করা হয়, অনেক মা মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। মাতৃমৃত্যুর হার আমাদের দেশে প্রসবজনিত কারণে অনেক বেশি ছিল। এই সেবাটা চালু হওয়ার পর আমরা উন্নতি করছি অনেক।
গর্ভকালীন সময়কে আমরা তিন ভাগে ভাগ করি। যদি অনিয়মিত ঋতুস্রাব থাকে, তাহলে রোগ নির্ণয়ের আগে বুঝতেও পারে না তার গর্ভাবস্থা হয়েছে। অনেকের বেলায় দেখা যায় গর্ভাবস্থা নির্ণয়ের আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। সেটা হলো একটোপিক গর্ভাবস্থা। এর হার অনেক উঁচু। এটা এমন একটি জটিলতা, রোগীকে যদি দ্রুত ব্যব্স্থা করা না হয়, রোগী মারা যায়।
প্রশ্ন : একটোপিক প্রেগনেন্সি কী? একটোপিক প্রেগনেন্সির জটিলতা কী?
উত্তর : বাচ্চা তো জরায়ুর ভেতর বসার কথা। এর ভেতরে সে বড় হবে। এখানে না বসে ফেলোপিন যে টিউব থাকে, সেখান থেকে ভ্রুণটা টিউবের মাধ্যমে জরায়ুতে এসে বসে। কোনো কারণে সে টিউবে বসে গেল।যেখানে যার থাকার কথা সেখানে না গিয়ে সেটা অন্য এক জায়গায় হলো। এ ছাড়া অনেক জায়গায় হতে পারে। এবডোমিনাল কেবেটিতে হতে পারে। জরায়ুর মুখে হতে পারে। ইউট্রাসের কর্ণারে হতে পারে। ওভারিতে হতে পারে। তবে টিউবই প্রচলিত জায়গা। টিউবের একটি সরু অংশ রয়েছে, সেখানে যদি হয় তাহলে খুব অল্প সময় এটা রাপচার হয়ে যায়। এটা তো আস্তে আস্তে বড় হবে। একটি পর্যায়ে এসে দেখা গেল সে আর বাড়তে পারছে না। এরপর সেটা ফেটে যায়। ফেটে গেলে তার ভিতরে রক্তপাত হতে পারে।
ফেটে গেলে যখন রক্তপাত হয়, তখন তীব্র ব্যথা হয়। গর্ভ যেখানে থাকে সেখানে ফুলটা থাকে। ফুলের সঙ্গে মায়ের রক্তের সম্পর্ক থাকে। এখান থেকে বাচ্চা কিন্তু পুষ্টি পায়।
প্রশ্ন : ফেটে যাওয়ার আগে কি তিনি বুঝতে পারবেন না?
উত্তর : না, বুঝতে পারবেন না। তবে গর্ভাবস্থার যে লক্ষণ, একটু বমি বমি লাগা বা দুর্বল লাগা, এগুলো হয়। ঋতুস্রাব বন্ধ হলো, এর সঙ্গে বমির প্রবণতা হয়। কিন্তু সে আর কিছু টের পাবে না। ফেটে গেলে জটিল ব্যথা হলে তারা বলতে পারে। রক্তপাত হওয়ার কারণে ব্যথা হয়। এরপর আস্তে আস্তে যখন অনেক বেশি রক্তপাত হয়ে গেল, তখন তার পাল্স বেড়ে যাবে, রক্তচাপ কমে যাবে। এক সময় দেখা যায় জটিলতার কারণে হয়তো সে মারা গেল। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়। এটি একটি মেডিকেল জরুরি অবস্থা। রাপচার যদি হয়, একমাত্র চিকিৎসা হলো সার্জারি করা।
প্রশ্ন : এর বাইরে আর কী কী সমস্যা হয়?
উত্তর : এর বাইরে হতে পারে অ্যাবরশন। অ্যাবরশন প্রথম ট্রাইমিস্টার, দ্বিতীয় ট্রাইমিস্টার দুটোই হতে পারে। অ্যাবরশন সম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ হয়। সম্পূর্ণ হয়ে গেলে সব বেরিয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চাটা পড়ে গেল, ফুল রয়ে গেল। সাধারণত কিছু আলাদা হয়ে ঝুলতে থাকে। বাকিটা লেগে থাকে। এর কারণে সেটি পড়ল না। তখন ইউট্রাস ব্লিডিংটা বন্ধ করতে পারে না। তখন রক্তপাত হতে থাকে। এই অ্যাবরশন যদি ঠিক মতো ব্যবস্থাপনা না হয়, তাহলে অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়ে, অ্যাবরশন হয়ে মা মারা যেতে পারে।
মোলার প্রেগনেন্সি রয়েছে একটা। নিউপ্লাস্টি অবস্থা। ফুলের মধ্যে টিউমার হয়। টিউমার যেটা হয় সেটা আঙ্গুরের থোকার মতো হয়। টিস্যু ইউট্রাসে থাকে। কোনো বাচ্চা থাকে না। ইউট্রাসের যে আকার গর্ভাবস্থায় থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বড় হয়ে যায়। যেকোনো টিউমারের বৃদ্ধিতো অনেক বেশি থাকে। লক্ষণ গর্ভাবস্থার মতো থাকবে। গর্ভাবস্থার লক্ষণ থাকবে এবং বেশি থাকবে। এদের বমি অনেক বেশি হয়। স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার তুলনায়। পেটটা বড় থাকে। যেই সময় যতটুকু বাড়ার কথা, তার তুলনায় অনেক বড় মনে হবে। যদি রোগী আগে আসে, তাহলে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে আমরা বুঝতে পারব। নিজে নিজেই রক্তপাত হয়। তাহলে এখানেও প্রচুর রক্তপাত হয়। টিউমারগুলো কিছু আংশিক বের হয়, কিছু ভিতরে থাকে। ভিতরে আগে থেকেই যদি রক্তপাত হতে থাকে, তবে এখানেও প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে যদি ব্যবস্থাপনা ঠিক মতো না হয়, এখানে মা মারা যেতে পারে।
থার্ড ট্রাইমিস্টার, সেকেন্ড ট্রাইমিস্টারে অ্যাবরশনতো রয়েছে, এর সঙ্গে কিছু রয়েছে। ফুলটা আমি জানি জরায়ুর নিচের দিকে থাকার কথা, সেটা যদি জরায়ুর নিচের দিকে থাকে, একে বলে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া। জরায়ুর নিচের যে অংশটা সেটা একটা সময় আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। যখন জরায়ুর অংশটা বাড়ে, তখন প্লাসেন্টা ছুটে যায়। ছোটা অংশ থেকে প্রচুর রক্তপাত হতে থাকে। এই প্লাসেন্টা প্রিভিয়াও কিন্তু খুব ভয়াবহ। এর ভাগ রয়েছে। ভাগ তিন ও চার যেটা, সেটা হলে খুব রক্তপাত হয়। প্লাসেন্টা প্রিভিয়া থাকলে আগে যদি সিজার হয়, তাহলে এদের পরবর্তী সিজারিয়ান সেকশনে ভয়াবহতা হয়। প্রসবের সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এখানে বাচ্চা ছোট থাকে। এতে তো মারাই যাবে। তবে পরিপক্ব বাচ্চা যদি হয়, তখন রক্তপাত হতে হতে একটি সময় দেখা যায় প্লাসেন্টার সার্কুলেশন ভালো হয় না। তখন বাচ্চা পেটে মারা যেতে পারে।
প্রশ্ন : এর বাইরে কি আরো কিছু জটিল অবস্থা রয়েছে?
উত্তর : আরো জরুরি অবস্থাগুলো হলো, একলামসিয়া, প্রি একলামসিয়া, প্রসবের সময় অবসট্রাকটিভ লেবার, বাচ্চা যোনিপথে আটকে যদি যায়, সেক্ষেত্রে মাও ঝুঁকিপূর্ণ বাচ্চার জন্য, এই অবসট্রাকটিভ লেবার হয়ে ফেটে যেতে পারে। ইউট্রাস ফেটে গেলেও সেরকম রক্তক্ষরণ হয়। এরপর রয়েছে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ। সেটিও একটি ভয়াবহ অবস্থা। রুটিন চেকআপ করলে এসব জটিলতা আগেভাগেই এড়ানো সম্ভব।