Beta

রোগ প্রতিরোধে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের ভূমিকা কী?

১১ মে ২০১৯, ২১:১৩ | আপডেট: ১১ মে ২০১৯, ২১:১৬

ফিচার ডেস্ক
রোগ প্রতিরোধে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের ভূমিকার বিষয়ে আলোচনা করেছেন ডা. ফেরদৌস আহমেদ খন্দকার ও ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন। ছবি : এনটিভি

রোগ প্রতিরোধে বর্তমানে একটি আলোচিত নাম প্রিভেন্টিভ মেডিসিন। প্রিভেন্টিভ মেডিসিন কী, রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা কী?

এ বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩৪৩৪তম পর্বে কথা বলেছেন ডা. ফেরদৌস আহমেদ খন্দকার।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চিকিৎসা পেশায় সাফল্যের সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন।

প্রশ্ন : প্রিভেন্টিভ মেডিসিন মেডিসিনের কোন অংশকে বুঝিয়ে থাকে?

উত্তর : মেডিসিনের বিদ্যার মধ্যে একটি হলো কিউরেটিভ মেডিসিন। অর্থাৎ আপনার রোগ হয়ে গেছে। শুধু সেই সময়কার চিকিৎসা দিবেন আপনি। এটি একদিনের হতে পারে, এক বছরেরর হতে পারে, দুই বছরের হতে পারে। আরেকটি হলো প্রিভেন্টিভ মেডিসিন। এটি হলো রোগ হয়নি, এখন রোগ যেন না হয়, এর জন্য একটি পরিকল্পনা। এখন নিরাময়যোগ্য যে মেডিসিন, এটি আবার বিভিন্ন রকম রয়েছে। যেমন :  প্রাইমারি প্রিভেনশন ও সেকেন্ডারি প্রিভেনশন। প্রাইমারি প্রিভেনশন হলো আপনার রোগটি হয়নি এখনো, এখন কী করা যায় এটি নিয়ে। ধরুন, সেকেন্ডারি প্রিভেনশন। অর্থাৎ আপনার হার্ট অ্যাটাক একবার হয়ে গেছে। এখন আপনার যে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তার একটি পরিকল্পনা থাকবে যেন সেকেন্ড হার্ট অ্যাটাক না হয়। এর জন্য আরেকটি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা থাকতে হবে। তো একটি প্রতিরোধ হলো একেবারে আমি হতে দেব না, অথবা আমি চেষ্টা করব যেন আর না হয়। আরেকটি হচ্ছে, হয়ে গেছে অসুবিধা নেই। আরেকবার যেন না হয়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে কোন কোন রোগ খুব বেশি মাত্রায় হয়, যেগুলো চেষ্টা করলে প্রতিরোধযোগ্য?

উত্তর : বাংলাদেশে প্রথম জেনারেশনের যেই অবস্থা ছিল, ১৯৭০ দশকে এবং ১৯৮০-এর দশকে, তখনকার দিনে মানুষ সংক্রমণ জনিত রোগে বেশি ভুগত। যেমন : ডায়রিয়া, যক্ষ্মা। এখন ধীরে ধীরে আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা বদলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের রোগগুলোর ধাঁচে আমরা বদলাচ্ছি। এতে আমরা সংক্রমণ জনিত রোগে মারা যাচ্ছি কম। আমরা মারা যাচ্ছি হৃদরোগে। মারা যাচ্ছি ক্যানসারে; অসংক্রামক রোগে।  এই প্রত্যেকটি রোগের আবার প্রিভেন্টিভ প্ল্যান বা প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা রয়েছে। শত শত বিজ্ঞানী কাজ করেছেন কোটি কোটি মানুষের ওপর। একটি পরিকল্পনা তাঁরা দিয়ে দিয়েছেন।

উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, একটি প্লেন আকাশে উড়বে, এটি লাখ লাখ মাইল চলার কথা। একে কি প্রত্যেকবার গ্যারেজে এনে চেক করতে হয়? তা কিন্তু নয়। গাড়ির ক্ষেত্রে ধরুন, প্রতি তিন হাজার মাইলে আপনার তেল পরিবর্তন করতে হবে। এটি একটি সেট ম্যানু। না করলেও পাঁচ হাজার মাইল পর্যন্ত চলবে। কিন্তু বাড়তি দুই হাজার মাইল গাড়ির ক্ষতি হয়ে গেল। এই জন্য বলা হয় আপনি তিন হাজার মাইলে তেল পরির্বতন করুন। ১০ হাজার মাইল হয়ে গেছে, আপনার টায়ারে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এর পরও টায়ারগুলো পরিবর্তন করুন। কারণ, টায়ারে কিছু ক্ষতি হবে। এটাতে চলতে গেলে আপনার জীবনের ওপর একটি হুমকি আসতে পারে। তো মানব জীবনের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন। তবে একটি সেট পরিকল্পনা করে দিয়েছেন। আপনার বয়স যদি ১৮ বছর হয়, আপনার এক ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হবে। ২১ হলে আরেক ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, ৫০ হলে আরেক ধরনের প্রতিরোধ, ৭০ হলে আরেক ধরনের প্রতিরোধ। আবার পুরুষ ও নারী ভেদেও এর পার্থক্য রয়েছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে কোন কোন রোগ রয়েছে যেগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব?

উত্তর : ১৯৯৮ সালে আমাদের যখন প্রশিক্ষণ হয়, আমি দেখেছি প্রতিটি ওয়ার্ডে, সেটা গাইনি ওয়ার্ড বলুন, মেডিসিন ওয়ার্ড বলুন, জরায়ুমুখের ক্যানসার খুব প্রচলিত। আমরা প্রতিদিনই একটি/দুটি রোগী দেখতাম। যুক্তরাষ্ট্রে প্র্যাকটিসের কারণে আমি একটি কেসও এমনটি দেখিনি। কেন এটি আলাদা? ওখানে প্যাপসমেয়ার নামে একটি পরীক্ষা রয়েছে। এটি এক থেকে দুই বছর পর পর করাতে হবে। ১৮ বছর পর থেকে শুরু হবে। এটি আপনাকে করতেই হবে। তাই, আপনার কোনো রোগের লক্ষণ নেই, এরপরও প্রতিটি মা-বোনের ১৮ থেকে ৭৪ পর্যন্ত, প্রতি বছর বা এক থেকে  দুই বছর পর পর আপনি এই পরীক্ষাটি করে যাবেন। এতে হবে কি, যদি পাঁচটি পর্যায় থাকে, শূন্য হলো একেবারে স্বাভাবিক, পাঁচ হলো ক্যানসার। আপনি পর্যবেক্ষণের মধ্যে ফেলে দিলেন। প্রতি দুই বছরে সেই মা বা বোন আপনার কাছে আসবে। আপনি পরীক্ষা করতে থাকবেন। তাহলে এই রোগটি আর শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পাবে না। তার আগেই একে ধরে একে চিকিৎসা করাতে হবে। এটি অনেকটা ফর্মূলার মতো। পশ্চিমা বিশ্বে রোগ প্রতিরোধের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। প্যাপসমেয়ার করা হয় জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য। ম্যামোগ্রাম করা হয় স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য। আপনার কোনো লক্ষণ নেই, আপনার বয়স ৪০ হয়েছে, আপনি একজন নারী আপনাকে ম্যামোগ্রাম করতেই হবে।

আপনি বাসায় থাকলেও আমি যদি চিকিৎসক হই আমার কাছে লিস্ট রয়েছে,  আমি তাদের ধরে ধরে নিয়ে আসব। বাংলাদেশে যেমন কিউরেটিভ মেডিসিন প্র্যাকটিস হয়। এগুলো নিয়ে কম কথা বলা হয়। রোগ হলে চিকিৎসকের কাছে যায়। রোগ ভালো হয়ে গেলে আর যায় না। প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবসময় অতটা মনোযোগী হয় না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনে কোথায় কোথায় আরো কাজ করার সুযোগ রয়েছে?

উত্তর : ধরুন, আমাদের চিকিৎসকদের নিজস্ব কোনো ডাটাবেজ নেই। আমার কাছে কত রোগী এসেছে আমার কাছে ডাটা বেজ নেই। আমি গত বছর কোন রোগীগুলো দেখলাম, যাদের আনা দরকার তারা আসেনি। কোনো অসুবিধা নেই ফোন করুন। অনেকে হয়তো বলবেন, বিজনেসের জন্য ফোন দিচ্ছে। আসলে সেটি নয়। এর একটি মূল বিষয় রয়েছে। ১০০ জনের মধ্যে পাঁচ জন হয়তো এই কথা বলবেন। আর ৯৫ জন রোগী খুশি হবেন। আমার চিকিৎসক আমাকে ফোন করেছে যাওয়ার জন্য। একেই আমরা প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বলি।

এখানে দুটো বিষয় কাজ করছে। চিকিৎসকের আন্তরিকতা কাজ করতে হবে। আর শরীরের ব্যবস্থাপনা কিন্তু আপনাকেই করতে  হবে। আমি চিকিৎসক হিসেবে হয়তো একটু ব্যস্ত। দায়িত্ব পুরোটা কিন্তু আপনার। আমি আপনার এই দলের কোচ। আপনি খেলোয়াড়। আমি শিখিয়ে দেব যে কী করতে হবে। তবে খেলতে হবে আপনার।

আপনার কোনো রোগ নেই, ১৮ থেকে ৭৫ এর মধ্যে বয়স, আপনি চিকিৎসকের কাছে যান।  আসলে রোগ প্রতিরোধে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের ভূমিকা অনেক।

Advertisement