ঝাল খেলেই কি গ্যাস্ট্রিক হয়?

গ্যাস্ট্রিক একটি প্রচলিত সমস্যা। কী কারণে এই সমস্যা হয় এবং এর চিকিৎসা কী, এ বিষয়ে কথা বলেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানুর রহমান। আজ ২২ ডিসেম্বর, এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিনের ২২৪৩তম পর্বে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়।
প্রশ্ন : গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিষয়। এমন লোক হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাঁর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নেই। কিংবা অনেকেই বলেন, আমার গ্যাস্ট্রিক হয়েছে। এ বিষয়টি আসলে কী? আর সাধারণত কী ধরনের সমস্যায় তাঁরা আক্রান্ত হন?
উত্তর : বৈজ্ঞানিকভাবে যে জিনিসটিকে গ্যাস্ট্রিক বলা হয়, সেটির আসল নাম হচ্ছে পেপটিক আলসার ডিজিজ বা পিইউডি। পাকস্থলী, ডিওডেনাম ও ইসোফেগাস—এই তিনটির যেকোনো জায়গায় যদি অ্যাসিডের কারণে ক্ষত হয়, এটাকে বলে পেপটিক আলসার ডিজিজ। এবং যখন বলা হচ্ছে গ্যাস্ট্রিক আছে, তখন বোঝা যাচ্ছে, তার পেপটিক আলসার রয়েছে। এটা পাকস্থলী বা ডিওডেনামে হতে পারে।urgentPhoto
আর মানুষ সাধারণত পেটে গ্যাস হলে একে গ্যাস্ট্রিক বলে। আসলে গ্যাস হলেই গ্যাস্ট্রিক নয়।
প্রশ্ন : তাহলে গ্যাস হচ্ছে, ঢেঁকুর উঠছে, অস্বস্তি কাজ করছে, গলার নিচে কিছু একটা চাপ চাপ বেঁধে আছে—এই বিষয়গুলো কী?
উত্তর : এটা বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক আলসার নয়। এটা হচ্ছে পেটে গ্যাস হয়। গ্যাস হচ্ছে, এর মানে নিজেই নিজের ঢোঁক গিলছি, বাতাস গিলছি। এটা নিজের অজান্তে হয়। এটা সাধারণত মানসিক চাপে থাকা লোকজনের হয়। এ জন্য যাঁরা বড় করে ঢেঁকুর তুলছেন, এটি কোনো গ্যাস্ট্রিক নয়, একে নন-আলসার ডিসপেপসিয়া বলে। মানে আলসার ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের মতো হয়। বুক জ্বালাও সরাসরি গ্যাস্ট্রিকের বিষয় নয়। যদি এমন হয় যে খালি পেটে বুক জ্বলছে এবং সেটা খাওয়ার পর কমে যাচ্ছে, এটা গ্যাস্ট্রিক। তবে এমনিতে বুক জ্বলছে, গলা জ্বলছে—এটা গ্যাস্ট্রিক নাও হতে পারে। বলা হয়, যত বেশি বুক জ্বলছে, গ্যাস্ট্রিক তত কম। গ্যাস্ট্রিকে জ্বালাপোড়া একটি লক্ষণ হতে পারে, এটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খালি পেটে হবে এবং খেলে এটা চলে যাবে। সে ভাত খাক অথবা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাক, এটি চলে যাবে।
এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিক আলসারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হচ্ছে, রাতের বেলা পেটের ব্যথা হয়ে তাঁদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। সাধারণত ভোরবেলা ৩টা থেকে ৪টার সময়।
আবার যাঁদের পায়খানার অসুবিধা হচ্ছে, এটিও গ্যাস্ট্রিক নয়। যাঁদের পেট ফুলে থাকছে ও গ্যাস বের হচ্ছে অনেক বেশি এবং বেশি বুক জ্বলছে—এই জিনিসগুলো সরাসরি গ্যাস্ট্রিক নয়।
প্রশ্ন : ডিসপেপসিয়া হোক বা গ্যাসট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ হোক কিংবা পেপটিক আলসার ডিজিজ হোক, এগুলোর সঙ্গে জীবনযাপনের ধরন ও খাবারের সম্পর্ক কতখানি?
উত্তর : গ্যাস্ট্রিকের সঙ্গে জীবনযাপনের ধরন এবং খাবার-দাবারের সম্পর্ক খুবই কম। এগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। যেমন—দক্ষিণ ভারতের লোকেরা খুব বেশি ঝালজাতীয় খাবার খায়। ওখানে মানুষকে আধা কেজি করে ঝালজাতীয় খাবার প্রতিদিন দিয়ে দেখা হয়েছে। দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে আলসার বেশি হয়নি। সাধারণ লোকের যেমন রয়েছে, ওদের মধ্যেও তাই রয়েছে। বেশি ঝাল খাওয়ায় কোনো প্রভাব ফেলছে না। তবে যার গ্যাস্ট্রিক আছে, তার ঝাল খেলে লক্ষণগুলো বেশি প্রকাশ পেতে পারে। গ্যাস্ট্রিক আছে, তবে চিকিৎসা নেই, ঝাল খাচ্ছে, ওই সময়ে একটু বেশি হতে পারে। তবে ঝাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হবে, সেটি ঠিক নয়।
ঝাল খেলে বা দেখলে বুক জ্বালা করছে, এগুলো জটিল কোনো লক্ষণ নয়। এগুলো একটি অস্বস্তি ভাব।
আর খাওয়ার পর বুক জ্বলে, ভাত খাওয়ার পর রাতে শুতে গেলে বুক জ্বলছে অথবা ভাত খাওয়ার আধা ঘণ্টা পর গলা দিয়ে পানি চলে আসছে এবং বুক জ্বলছে—এগুলো হলো গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স। সাধারণত পেট সম্পূর্ণ ভরার পর বুক জ্বালা হয়। আবার হয়তো নির্দিষ্ট সময়ে হয়। অন্য সময়ে হয় না, এটিও গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স। এটা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা না, এখানে কোনো আলসার নেই।
প্রশ্ন : গ্যাস্ট্রিকের রোগীর বেলায় বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে খেতে হবে বা ভাজা-পোড়া-তেলজাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না।এ বিষয়ে আপনার মত কী?
উত্তর : সেটা হলো নন-আলসার ডিসপেপসিয়া, এটাতে গ্যাস হয় বেশি, জ্বালা হয় বেশি, পেট ফুলে থাকে বেশি—সেটাতে ভাজা-পোড়া সাংঘাতিক ক্ষতিকর। তবে যদি এটি আলসার হয়ে থাকে, যেহেতু আলসারের একটি চিকিৎসা রয়েছে এবং অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়াও এরা ভালো হয়ে যায়, এ জন্য এখানে অনেক বেশি সমস্যা হয় না। তবে ওই খাবারগুলো লক্ষণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যাঁর ব্যথা রয়েছে, তাঁর ব্যথাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যাঁর জ্বলা রয়েছে, সেটা বাড়িয়ে দিতে পারে। এই বিষয়গুলো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য আজকাল চিকিৎসার বিষয়টি এমন দিকে যাচ্ছে যে ব্যক্তির যা মনে চায় তাই খাবে, চিকিৎসক শুধু ওষুধ দিয়ে ভালো করে দেবে। খাওয়ার সীমাবদ্ধতা ছাড়া চিকিৎসা করতে চাই। আমরা আশা করছি, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এমন চিকিৎসা এসে যাবে, যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে খাবারের বেলায় বাছতে হবে না।
নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী খাবারের কথা বলতে গেলে, রিফ্লাক্স বলে মানুষের শরীরে একটি জিনিস রয়েছে, আমি যদি প্রতিদিন ২টার সময় ভাত খাই, একদিন যদি না খাই সে সময়ে পেট অ্যাসিডে ভর্তি হয়ে যাবে। তবে আমি যদি সেখানে দেরি করে খাই, আমার লক্ষণটা বেড়ে যাবে। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার উপকার রয়েছে। আমাদের শরীর একটি অভ্যাসের মধ্যে চলে যায়। অভ্যাসের ব্যতিক্রম হলেই সমস্যা হয়। তবে ডিওডেনাল আলসার যেটা, সেখানে যদি প্রায় প্রায় খাবার দেওয়া হয়, তাঁদের লক্ষণগুলো কমতে সাহায্য হয়। তবে এখন যেই চিকিৎসা পেপটিক আলসারের রয়েছে, এখানে খাওয়ার বিষয়ে বাছতে হবে না। এর পরও আমরা বলি, আপনার যেটা খেলে অসুবিধা মনে হয়, সেটি এড়িয়ে যান।
প্রশ্ন : এই পেপটিক আলসার রোগ হচ্ছে কেন? এর চিকিৎসা কী দিয়ে থাকেন?
উত্তর : বলা হয়, পাকস্থলীর মধ্যে অ্যাসিড এবং নন-অ্যাসিড দুটো জিনিস রয়েছে। এটা যখন ভারসাম্যহীন হয়ে যাবে, যখন অ্যাসিডটা বেড়ে যাবে, নন-অ্যাসিড কমে যাবে, তখনই সেখানে একটি আশঙ্কা রয়েছে, আলসার বৃদ্ধি পাওয়ার। তখন পেপটিক আলসার হয়।
প্রশ্ন : এখানে জীবাণুঘটিত কোনো বিষয় আছে কি?
উত্তর : জীবাণুঘটিত একটি বিষয় রয়েছে। যেমন—এইচ পাইলোরি বলে একটি সংক্রমণ রয়েছে। দেখা যায়, ওই সংক্রমণ যাদের মধ্যে রয়েছে, তাদের মধ্যে আলসার বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা লোকদের এবং ওদের মধ্যে একবার ভালো হওয়ার পর আবার আলসার হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। ওই জীবাণু থাকলে গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশে যে তথ্য আছে, এ দেশের জন্য এটি কম প্রযোজ্য। আমাদের দেশে জীবাণুটি অনেক বেশি, তবে আলসারের সংখ্যা কম। পশ্চিমা বিশ্বে এইচ পাইলোরি জীবাণুর চিকিৎসা দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এটি পরীক্ষা করারও দরকার নেই। কারণ শতকরা ৯০ জনের ভেতর জীবাণুটি রয়েছে। এ জন্য পরীক্ষা না করে যখন আমার মনে হবে এটি জটিল পেপটিক আলসার রোগ এবং বারবার হচ্ছে, তখন আমরা চিকিৎসা দিই।