অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা কী?

ডায়াবেটিস একটি পরিচিত শব্দ, পরিচিত সমস্যা। ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ছে। বয়স হলে ডায়াবেটিস যেন এখন একটি অনিবার্য বিষয়। অনেকের কম বয়সেও হচ্ছে ডায়াবেটিস। আজ ১১ অক্টোবর এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২১৭১তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও বারডেম হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন।
প্রশ্ন : এই ডায়াবেটিস বিষয়টি আসলে কী?
উত্তর : কারো ডায়াবেটিস হয়েছে এমন শুনলে ছোটোবেলায় আমরা ভয় পেতাম। এখন আর সেটি হয় না। ভয়ের কিছু হিসেবে এখন আর নেই। এমন পরিবার নেই যেখানে ডায়াবেটিস নেই, এমন জায়গা নেই যেখানে ডায়াবেটিস নেই। ডায়াবেটিস আসলে সব দেশেই বেশি। আমাদের দেশে তো ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ লোকের রক্তের শর্করায় অস্বাভাবিকতা রয়েছে। আর যার ডায়াবেটিস হয়েছে তাদের হার প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মানে, প্রায় দেড় কোটি লোকের ডায়াবেটিস আছে। তাই অনেকেই এ রোগে ভুগে থাকেন।
আমরা প্রায় সবাই জানি রক্তে শর্করা (সুগার) বেশি হলে ডায়াবেটিস হয়। উপসর্গও অনেকে জানেন। তবে সমস্যা হলো, সাধারণত অনেকেরই উপসর্গ নিয়ে ডায়াবেটিস প্রকাশ পায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রক্ত পরীক্ষা করে ধরা পড়ে।
অনেকে সন্দেহ করেন, আমরা ওজন কমে যাচ্ছে, খাই কাজে লাগে না। রাতের বেলা উঠে পানি খাওয়া লাগে। ক্ষুধা খুব বেশি লাগে। প্রস্রাবের চাপ এলে ধরে রাখতে পারি না। তখন তারা পরীক্ষা করে। এটা হয়, যখন সুগার অনেক বেশি হয়ে যায়। আরেকটি বিষয় হলো এই উপসর্গগুলো টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের।
ডায়াবেটিসকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। টাইপ ওয়ান, টাইপ টু এবং অন্য কোনো কারণে ডায়াবেটিস। আরেকটি ভাগ হলো গর্ভাবস্থায় যে ডায়াবেটিস হয়- জিডিএম।
টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস মানে হলো, যার শরীরে ইনসুলিন নেই। আগে একে বলা হতো ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস, মানে ইনসুলিন ছাড়া রোগী বাঁচে না।
আর টাইপ টু মানে ইনসুলিন আছে, কিন্তু কাজ করে না। সেজন্য বেশি সমস্যা না হলে হয়তো প্রকাশ পায় না। সেজন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরীক্ষা করতে গিয়ে এটা ধরা পড়ে।
এই ডায়াবেটিস কীভাবে ধরা পড়ে? ধরেন, একজন হয়তো অস্ত্রোপচার করতে গেছে, তার বিভিন্ন পরীক্ষা করতে গিয়ে সমস্যাটা ধরা পড়ল। মেডিকেল চেকআপ করতে গিয়ে ধরা পড়ল। অথবা কারো হয়তো একটি ফোঁড়া হয়েছে, সারছে না। অথবা বুকে একটি সংক্রমণ হয়েছে, সারতে দেরি হচ্ছে। তখন সন্দেহ হয়। অথবা হয়তো ছোট্ট একটা অসুখ, সেটাও সারতে সময় লাগছে। তখন তারা পরীক্ষা করে।
এখন রক্তের সুগার কতো হলে ডায়াবেটিস হবে? এর একটি মাপ রয়েছে। সবার এক রকম না। রক্তের সুগার স্বাভাবিক একটি, অস্বাভাবিক একটি, আর ডায়াবেটিস হওয়ার আর একটি।
একজন লোকের যদি ৬ মিলিমোল পার লিটারের কম রক্তের সুগার থাকে ফাস্টিংয়ের সময়, তাহলে সমস্যা নাই। ফাস্টিং মানে আট ঘণ্টা যদি আপনি না খেয়ে থাকেন। রাত ১২টায় খাবার খেলেন, এরপর সকাল ৮টায় যদি পরীক্ষা করে দেখেন যে আপনার রক্তের সুগার কম তাহলে ডায়াবেটিস নাই। কিন্তু যদি আট ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর সাত বা সাতের বেশি যদি হয় তবে ডায়াবেটিস হয়েছে। আর ছয় এবং সাতের মাঝে যেই অবস্থা একে ডায়াবেটিস বলে না। একে বলা হয় ইমপেয়ার ফাস্টিং গ্লুকোজ। এই ভাগ করার কারণ হলো, এসব লোকের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের থেকে তিনগুণ বেশি, এক। আর দুই হলো ডায়াবেটিসের যে জটিলতাগুলো এখানেও সেই একই জটিলতা থাকে।
প্রশ্ন : অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিসের জটিলতা কী হতে পারে?
উত্তর : প্রতিদিনের অসুখে জীবনযাপনের ধরন মেনে চলা খুব কঠিন। মানুষের স্বভাব বেশ জটিল। সেই জন্য যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের সবসময় বলি এটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করার আবার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ থাকে। লক্ষ আগে বলি, রক্তের সুগার যদি খাওয়ার আগে ছয় হয় তাহলে তো নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেল। যদি খাওয়ার পর আট থাকে তাহলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়া হিমোগ্লোবিন এওয়ানসি পরীক্ষার ফল যদি ৭-এর নিচে থাকে তাহলে আপনার ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে।
ডায়াবেটিস হলে বিভিন্ন জটিলতা হয়। জটিলতার ক্ষেত্রে দুটো বিষয়। নার্ভ, চোখ, কিডনি- তিনটিকে বলে মাইক্রোভাসকুলার কমপ্লিকেশন। আরেকটি হলো হার্ট, মস্তিস্ক, রক্তনালী- ম্যাক্রোভাসকুলার কমপ্লিকেশন। এসব জায়গার সমস্যা হতে পারে ডায়াবেটিসের ফলে। আপনি যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে জটিলতাগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন তাহলে ভালো।
প্রশ্ন : এই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর : নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। ডায়াবেটিসের আসলে চিকিৎসা তিনটি। জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করা। এর অর্থ কী? খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। খাওয়া নিষেধ নেই। তবে হিসাব করে খেতে হবে। ডায়বেটিস রোগী চিনি এবং সিগারেট ছাড়া সবই খেতে পারে। ধরেন যার ডায়াবেটিস নেই সে আনারস তিনটি খেয়ে নিল। আর যার ডায়াবেটিস আছে সে হয়তো একফালি খেল। অনেকে বলে রুটি খাই, সুগার বেড়ে যাবে তাই ভাত খাই না। ভাতও আপনি খান, তবে হিসাব করে। খাদ্যতালিকা এমনভাবে করেন যেন ওজন সীমার মধ্যে থাকে। ডায়াবেটিস আছে যার, বা নাই যার- সবার জন্যই খাবারটা এভাবে গ্রহণ ভালো।
আরেকটি হলো আপনি যদি প্রতিদিন আধা ঘণ্টা ব্যায়াম করেন তাহলে ভালো। আপনি যদি ৩০ বা ৪৫ মিনিট করে পাঁচদিনও হাঁটেন এটি খুব উপকারী। আরেকটি হলো ওষুধ।
এ ছাড়া আরেকটি হলো শিক্ষা। আমরা বাংলাদেশের লোকেরা ভাগ্যবান প্রফেসর ইব্রাহিমের মতো একজন লোক জন্মেছিলেন। সব কিছুর পাশাপাশি উনি একটি বই বের করেছেন যেটা ইউনিক। এই বইটি পড়লে ডায়াবেটিস সম্বন্ধে সব জ্ঞান হয়ে যেত। তাহলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য এই বিষয়ে জ্ঞানও লাগবে।
প্রশ্ন : ডায়াবেটিস হওয়াটা যতটুকু কষ্টের সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখাটা তার চেয়ে আরো বেশি কষ্টের এবং জরুরি। সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে অনেক জটিলতা থেকে মুক্ত থাকা যাবে ...
উত্তর : শুধু মাত্র ডায়াবেটিস নয়, সবকিছুর জন্য প্যাটার্ন ভালো হওয়া ভালো। স্বাস্থ্যকর খাওয়া, হাঁটা সব কিছুর জন্যই ভালো। ডায়াবেটিস হয়েছে কিন্তু হাঁটছেন না তাহলে হবে না।