Beta

শিশুর মানসিক সুস্থতায় পারিবারিক বন্ধনের ভূমিকা কী?

২২ মার্চ ২০১৮, ১৫:২৮

ফিচার ডেস্ক

একটি সুন্দর পারিবারিক বন্ধন শিশুর মানসিক সুস্থতায় অনেক বড় ভূমিকা পালন করে; শিশুকে পরবর্তীকালে গড়ে ওঠতে সাহায্য করে।

শিশুর মানসিক সুস্থতায় পারিবারিক বন্ধনের ভূমিকার বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩০৩৫তম পর্বে কথা বলেছেন মোহাম্মদ সেলিম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগে পিএইচডি গবেষণারত।

প্রশ্ন : শিশুর সঙ্গে পরিবারের বন্ধন- কীভাবে দেখেন বিষয়টিকে?

উত্তর : শিশুর সঙ্গে পরিবারের যে বন্ধন, সেই বন্ধন শিশুর জন্ম হওয়ার পর থেকেই তৈরি হওয়া শুরু হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়স হলো ছয় মাস থেকে তিন বছর। আসলে আমরা সাধারণ মানুষরা মনে করি এই বন্ধনটা পড়ে তৈরি হয়। ছয় মাস থেকে তিন বছরের মধ্যে যেই বন্ধনটি হয়, সেটি খুব শক্তিশালী। এটি শিশুর মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। বন্ধনের যে ধরন, সেটি গেঁথে যায় তার মস্তিষ্কে। এই বন্ধনের যে প্রভাব সেটি সারা জীবনব্যাপী চলতে থাকে যদি বিভিন্ন বয়সে সেই বন্ধনের পরিবর্তনের চেষ্টা আমরা না করি।

ধরা যাক, একটি শিশুর জন্মের তিন বছরের সময় বা আড়াই বছরের সময় মা কোনো কারণে তার কাছ থেকে সরে গেল। হতে পারে পড়াশোনার কারণে, চাকরিগত কারণে। তখন কিন্তু শিশুর একটি অনিরাপদ মানসিক অবস্থার তৈরি হয়। আবেগীয়ভাবে অনেক বেশি ভয় তার ভেতরে তৈরি হয়। এই ভয় ও আবেগীয় অনিশ্চয়তা কিন্তু তার ভেতরে মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। এটি পরবর্তী জীবনে তার ভয় তৈরিতে এবং অবিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।

প্রশ্ন : অনেক সময় দেখা যায়,ওই সময় মায়ের চেয়ে বেশি অ্যাটাচমেন্ট (সংযুক্তি) নানি-দাদির সঙ্গে হয়ে গেছে। এমনও তো আমরা দেখি। এই বিষয়ে আপনার মত কী?

উত্তর : হ্যাঁ, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিশুর যদি ওই সময়ে একজনের ওপর বন্ধন শক্ত হয়, তাহলে তার কিন্তু পরবর্তী জীবনে অন্যদের ওপর বন্ধন তৈরি করতে অসুবিধা হয়। বন্ধনকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন একটি নিরাপদ বন্ধন, একটি অনিরাপদ বন্ধন, বৈষম্যমূলক বা বঞ্চনামূলক বন্ধন।

আবার শিশু বুঝতে পারে না তার বাবা-মা বা অন্যরা যে আবেগীয় বন্ধনের সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন সেটার ধরন কেমন।

প্রশ্ন : মা-বাবার ভালোবাসা সন্তানদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমরা কীভাবে পালন করব?

উত্তর : মা-বাবা হিসেবে আমাদের মূল বিষয়টি হচ্ছে একটু জ্ঞান অর্জন করা। একটু সচেতন হওয়া। এই বিষয়গুলোর অভাবে আমাদের এ রকম ঘটে। যেমন, শিশু যখন আড়াই, তিন বছরে বা দুই বছরে হাঁটছে, খেলতে যাচ্ছে, অনেক মা রয়েছে তাকে খেলতে সুযোগ দেন এবং লক্ষ করেন যে শিশুটি আসলে কোথায় যাচ্ছে, দুর্ঘটনার মধ্যে পড়ছে কি না, সেটি তিনি লক্ষ করেন এবং সেইভাবে শিশুকে সুরক্ষিত করে। এটি এক ধরনের বৈশিষ্ট্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিশু যখন খেলতে যাচ্ছে, মা-বাবা তাকে খেলতে দিচ্ছে না। আটকে রাখছে। দিচ্ছেই না যেতে। বাড়তি সুরক্ষা দিচ্ছে ভয়ে। ভাবছে, পড়ে যাবে, ব্যথা পাবে। আবার অনেক মা-বাবা এমন রয়েছে যে শিশু খেলছে, সে ব্যথা পেল, কষ্ট পেল, সেগুলো কোনোভাবে লক্ষ করছে না। একেবারেই খেয়াল করছে না। এই তিন ধরনের বিষয়ে কারণে শিশুর কী হবে, তার মায়ের প্রতি, আত্মীয় স্বজনদের প্রতি এবং পৃথিবীর প্রতি তার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ধারণা তৈরি হবে। এই ধারণা পরবর্তী জীবনে তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। কারণ, তখন সে পৃথিবীকে সুরক্ষিত মনে করবে না। যেই শিশুটা পড়ে গেল, ব্যথা পেয়েছে, কষ্ট পেল, কিন্তু মা বাবা খেয়াল রাখল না তখন সে মনে করবে পৃথিবীতে কেউ তাকে ভালোবাসে না। বা আমি ভালোবাসার যোগ্য না, বা আমি ভালোবাসার মতো নই। আবার উদাহরণ দিয়ে বলি, যেই শিশুকে অতি সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে, সে পরে কোনো কিছুতে যখন ব্যর্থ হবে, তখন সে আর সামনে এগোবে না। চ্যালেঞ্জ নিতে বা কোনো একটি কিছুতে এগোতে তার সাহস বা আত্মবিশ্বাস থাকবে না।

হয়তো সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, একটি বিষয়ে সে খারাপ করেছে, একটু কঠিন হয়ে এসেছে, তার সামনে, তখন এই ধরনের শিশু ওই প্রচেষ্টা নিয়ে আর সামনে এগোবে না। পড়াশোনাটা ছেড়ে দিবে। আরেক জায়গায় যাবে।

ঠিক একই রকমভাবে যারা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠছে, আমি বলতে চাচ্ছি যে যেসব মা-বাবা শিশুকে সংবেদনশীলভাবে বড় করছেন, তারা পরে মানসিকভাবে স্থির হবেন। চ্যালেঞ্জ নিতে পারবেন। নিজেদের যে সমস্যাগুলো আসবে সেগুলো যথাযথভাবে সমাধান করতে পারবেন।   

প্রশ্ন : এই তিন ধরনের ক্ষেত্রে আপনি কোনটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন?

উত্তর : আসলে তিনটির মধ্যে প্রথমটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমরা বলি। শিশুকে খেলতে দিব, তার যে দায়িত্ব সেগুলো পালন করতে দিব। সঙ্গে সঙ্গে আমি খেয়াল রাখব, সে যেন বিপদে না পড়ে। সেজন্য ভীত না হয়ে যায়, সে কোনো ধরনের বিপদে পড়ার আগেই আমি যথাযথ পদক্ষেপ নেব। এই ধরনের ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে একটি আস্থার জায়গা তৈরি হয়, তার নিজের প্রতি, তার কেয়ার গিভার (যত্ন প্রদানকারী)- এর প্রতি, পৃথিবীর প্রতি। তার ভেতরে একটি বোধ তৈরি হয়। বাকি দুই ধরনের যেটি বৈপরিত্তমূলক এবং বর্জনমূলক ক্ষেত্রে মা কখন শিশুকে আদর করবে বা রেগে যাবে, সেটি সন্তান বুঝতেই পারে না। হয়তো সেটি মায়ের জন্য বা অন্যান্য কাজের জন্য। সেই ক্ষেত্রে সন্তানকে ওই বোধ দিতে হবে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করবে, কাজ করবে, তোমার জন্য আমরা সুরক্ষিত একটি জায়গা তৈরি করে রেখেছি। এই বোধ যখন তার মধ্যে তৈরি করবে, তার জন্য পরে একটি সুস্থ মানসিক দৃঢ়তা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠবে। সে জীবনে সফল, জয়ী হবে। মানুষের জীবনে বিভিন্ন সমস্যা আসবে, ঝড় আসবে, সেটিই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন : আমরা যেটি দেখি যে যুব সমাজের অবক্ষয়, জঙ্গী বাদ- এসবের পেছনে কি এই বিষয়গুলো বড় প্রভাব  ফেলছে?

উত্তর : বর্তমান যে মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো হচ্ছে, সেখানে কাউন্সেলিং সাইকোলজি ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করছে তারা কিন্তু বলছে, শিশুর এই বিকাশের সময় যে আবেগীয় বন্ধন এবং সামাজিক বন্ধন, এগুলোর কারণে পরে তাদের জীবনে বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতা, অপরাধ প্রবণতা, মাদকাসক্তি, অ্যান্টি সোস্যাল পারসোনালিটি (সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্ব) যেমন অন্যকে হত্যা করা, এই চার ধরনের নেতিবাচক বিষয়গুলো ওই দুই ধরনের নেতিবাচক বিষয়ে যারা বেড়ে ওঠছে, তাদের মধ্যে হওয়ার আশঙ্কা অনেক অনেক বেশি।

সুতরাং আমরা আমাদের সন্তানদের যদি সুস্থ বন্ধন দিতে পারি, নিরাপদ বন্ধন দিতে পারি, সুরক্ষিত বন্ধন দিতে পারি, তাহলে আমাদের সন্তানগুলো মানসিক বিপর্যস্ত হওয়া, মাদকাসক্ত হওয়া- এগুলোর ঝুঁকি থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকবে। সুতরাং এই ক্ষেত্রে আমি এনটিভির মাধ্যমে বা আপনাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিভাবকদের প্রতি বলব, সন্তানকে সুরক্ষিত নিরাপদ বন্ধন দিয়ে গড়ে তুলুন।  আমাদের সন্তান আমাদের সম্পদ হবে। দেশের সম্পদ হবে। 

Advertisement