শিশুদের এনিমিয়ায় করণীয়

শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গিয়ে এনিমিয়া বা রক্ত স্বল্পতা হয়। সঠিক খ্যাদ্য গ্রহণ করলে এই সমস্যা থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া য়ায়। আজ সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ১৯৫৫তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবীর হোসেন মোল্লা।
প্রশ্ন : সাধারণত এনিমিয়া বলতে আমরা কী বুঝি?
উত্তর : এনিমিয়া কথাটি একটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। সোজা বাংলায় যাকে বলা হয় রক্ত স্বল্পতা। এটি যদি কখনো অনেক বেশি হয় তখন আমরা সাধারণভাবে এটিকে রক্ত শূন্যতা বলি।
প্রশ্ন : শিশুর এনিমিয়া হওয়ার পেছনের কারণ কী?
উত্তর : শিশুদের রক্ত শূন্যতা বা রক্তস্বল্পতা হওয়ার অনেক কারণ আছে। যেসব কারণ আমরা বেশি পাই, সেগুলো হলো, পুষ্টি কম থাকার জন্য এনিমিয়া। রক্ত তৈরি করার জন্য যেসব উপাদান খুব জরুরি তার মধ্যে আয়রন অন্যতম। আয়রণ ঘাটতির জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রক্ত শূন্যতা হয়ে থাকে। তা ছাড়া কিছু কিছু ভিটামিন আছে যেগুলোর ঘাটতির জন্য রক্ত শূন্যতা হয়।
এর বাইরেও একটি গ্রুপ আছে, যেটি আমাদের মতো দেশে হয়। সেটি হলো থেলাসেমিয়া। রক্তে হিমোগ্লোবিনের জন্মগত অথবা বংশগত সমস্যার জন্য এ রোগ হয়ে থাকে। তাহলে মূলত আমরা যদি এটিকে দুটি ভাগে ভাগ করি। তাহলে একটি হলো আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা। আরেকট হলো হিমোগ্লোবিন গঠনে জন্মগতভাবে সমস্যা। যেটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবে থেলাসেমিয়া বলি।
এই আয়রন ঘাটতি কিন্তু অনেক কারণে হয়ে থাকে। তার ভেতরে একটি হলো কোনো শিশু যদি জন্মের সময়ই ছোট হয়ে জন্মায়। এর জন্য গর্ভাবস্থায় মায়ের একটি বড় ভূমিকা থাকে।
যেহেতু সে পরিপুষ্ট হওয়ার আগেই জন্ম নিচ্ছে সুতরাং তার শরীরে রক্ত উপাদানগুলো তৈরি করার মতো পরিপূর্ণ রসদ পায় না। পৃথিবীতে আসার পর এই ঘাটতির কারণে আস্তে আস্তে তার রক্ত শূন্যতা হতে পারে। এটি একটি বড় কারণ।
তা ছাড়া আয়রন ঘাটতির মতো রক্তস্বল্পতার জন্য আমাদের দেশে কৃমি একটি বড় ভূমিকা রাখে। যেকোনো ধরনের কৃমি, যেটা আমাদের শরীরের পুষ্টি খেয়ে ফেলে। এই পুষ্টিগুলোর মধ্যে আয়রন এবং ভিটামিনও আছে। সুতরাং এগুলো হলো সার্বিকভাবে মূল কারণ।
প্রশ্ন : মায়ের পেট থেকে শিশুটি পরিপূর্ণ পুষ্টি না পেয়ে আসার কারণে যে তার রক্ত শূন্যতা বা রক্তে ঘাটতি হচ্ছে এটি প্রতিরোধে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর : প্রতিরোধ তো একটি জায়গায় নয়। বিভিন্ন ধাপে। গর্ভবতী অবস্থায় কিন্তু মায়ের পুষ্টির দিকে ভীষণ নজর দিতে হবে। এই মায়ের জন্য যে পুষ্টির পরামর্শ দেওয়া বা গর্ভকালীন আয়রন বর্ধনের জন্য যেসব ওষুধপত্র সেগুলো একজন স্বাস্থ্যকর্মী দেবে। তাই ওই সন্তানসম্ভবা মাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চেকআপ অবশ্যই করাতে হবে।
তারপর আমরা মায়ের খাবারের কথা বলি। কিছু কুসংস্কার আছে। বেশি খেলে শিশু বড় হয়ে যাবে। বের হতে অসুবিধা হবে। এগুলো ভুল। মায়ের এখানে অত্যন্ত উন্নতমানের পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। যেসব শিশু আগে প্রসব (প্রিমেচিউর ডেলিভারি) হয়ে যায় তাহলে জন্মের পর একটি নির্দিষ্ট সময় সাপ্লিমেন্টারি দিতে হয়। যেমন : একটি প্রিমেচিউর শিশু কম ওজনের হয় (আড়াই কেজির কম)। গর্ভকালীন শিশুর দুই সপ্তাহ বয়স থেকে সাপ্লিমেন্টারি দেওয়া শুরু করি। যাতে এগুলোর ঘাটতি না হয়। দুই সপ্তাহ বয়স হলে আমরা তাকে ভিটামিন দেই, ফলিক এসিড দেই। আবার যখন সে দেড় মাস বয়সের তখন তাকে আয়রন দেওয়া শুরু করি। যাতে করে প্রিমেচিউর শিশুটা ভবিষতে আয়রন ঘাটতিজনিত সমস্যায় না ভোগে। এ ছাড়া আমরা সব থেকে বেশি জোড় দেই মায়ের দুধ খাওয়ানোকে। মায়ের দুধের মধ্যে আয়রন আছে। তা ১০০ ভাগ শিশুর রক্তের মধ্যে ঢুকতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আমাদের সমাজে এই তথ্যগুলো বারেবারে দেওয়ার পরও অনেক মা-বাবা আছেন যাঁরা শিশুকে শখ করে বাজার থেকে দুধ কিনে খাওয়ান। এটি যে শিশুটির জন্য কত ক্ষতিকর তা তারা উপলব্ধি করেন না। এ ছাড়া ছয় মাস পর অনেক মা অন্য খাবার দিতে চান বা অন্য দুধ দিতে চান। তখন আমি বলি, এখানেই আপনাদের ভুল ধারণা।
বাড়ির তৈরি খাবার এবং এর পাশাপাশি বুকের দুধ শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কিন্তু যেই খাবারটা আপনি বাজার থেকে কিনছেন সেটি বাণিজ্যিক পণ্য। সেটি সুস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি করা হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেটি হয়, খাবারটি বাজার থেকে কিনলে এর মধ্যে পুষ্টিমান কতটুকু থাকে সেটি আমরা জানি না এবং এগুলো খাওয়ার পর অনেক শিশুর আয়রন ঘাটতি হয়। এ কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
প্রশ্ন : যখন শিশু এ জাতীয় রক্ত শূন্যতায় ভোগে তখন কী দেখে আপনারা সেটি বুঝতে পারেন?
উত্তর : আমরা প্রথমেই বলেছি, এনিমিয়া মানে হচ্ছে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়া। এই হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। আর শরীরের কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃশ্বাসের সাথে বের করে দেওয়া।
একটি শিশুর যখন রক্তশূন্যতা হবে তখন কিন্তু শরীরে ঠিকমতো রক্ত পৌঁছাবে না। এর ফলে শিশুটি বিরক্ত হয়ে যায়। সবসময় অস্থির থাকে, ঘেন ঘেন করে।
শিশুটি ক্ষুধামন্দা হয়ে যায়। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ থাকে না। চোখ, হাত, মুখ ফ্যাকাসে দেখায়। এই ফ্যাকাসে ভাব দেখলে আমরা বুঝতে পারি শিশুর রক্ত শূন্যতা হয়েছে। এটি সম্ভবত আয়রন ঘাটতির জন্য হয়েছে। তখন দুই একটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা শুরু করি।
প্রশ্ন : তখন কী ধরনের পরামর্শ দেন?
উত্তর : রক্ত তৈরি হওয়ার জন্য যে আয়রন, সেটি যেসব খাবারের মধ্যে আছে সেগুলো খেতে বলা হয় এবং যে খাবারগুলোর মধ্যে আয়রন কম সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
যে খাবারগুলো দেখতে সাদা যেমন বাজারে যেসব বাণিজ্যিক পণ্য পাওয়া যায় সেগুলো দেখতে সাদা, গরুর দুধ সাদা, বার্লি সাদা, সাবু সাদা, নুডলস সাদা এই খাবার গুলো যদি বেশি পরিমাণে দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়ানো হয় তখন শিশুর রক্তশূন্যতা হবে আয়রনের ঘাটতির কারণে।
সুতরাং আয়রন সম্বৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমন : লাল মাংস, ডিম, ডিমের কুসুম, মাছ, বিভিন্ন রকম শাকসবজি। এগুলোর মধ্যে প্রচুর আয়রন থাকে। এগুলো একটু বেশি খাওয়াতে হবে।
প্রশ্ন : শিশুরা এই জাতীয় খাবারগুলো খেতে আগ্রহ বোধ করে না। সে ক্ষেত্রে কী করতে হবে?
উত্তর : শিশুকে খাওয়ানোর জন্য যে সময় দিতে হবে সেই সময় আমাদের নেই। আজকে আমাদের যে যান্ত্রিক জীবন এই জীবনে অনেক মা বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত থাকেন। শিশুকে খাওয়ানো একটি ধৈর্যের বিষয়। অনেক প্রস্তুতি নিয়ে খাওয়াতে হয়। তবে এটি খুব কঠিন কিছু নয়।