মহৎ পেশার মানুষ
জীবনে সৎ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ : অধ্যাপক এ কে আজাদ

দেশে ডায়াবেটিস রোগীদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এবং একই সঙ্গে অন্যান্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট নাম অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। দুই দশক ধরে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী ডায়াবেটিস সেবা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।
২০০৭ থেকে সারা বিশ্বে ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশে ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরিতে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে।
তাঁর প্রচেষ্টায় বারডেম রূপান্তরিত হয়েছে একটি উন্নতমানের জেনারেল হাসপাতালে। বাংলাদেশের গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি স্বাস্থ্যসেবারও প্রবর্তক তিনি। এ দেশে এন্ডোস্কোপিক সেবারও তিনি পথপ্রদর্শক। স্বাস্থ্য জনশক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে অনন্য ভূমিকা। তাঁর বিশেষ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, বারডেম নার্সিং কলেজ প্রভৃতি।
বয়স ৭০ পেরোলেও এখনো সদ্য তরুণের মতোই গণমুখী এই মানুষটি এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন তাঁর জীবনের গল্প।
অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম আমার
বাংলাদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম আমার। ১৯৪১ সালে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে আমার জন্ম হয়। ভালো চিকিৎসার সুবিধা গ্রামে তেমন ছিল না। মনে মনে ভাবতাম, যদি কখনো সুযোগ পাই মানুষের সেবা করব। আর চিকিৎসক হলেই সেটি ভালোভাবে করা যায়।
আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তিন ভাই ও তিন বোন আমরা। বাবার নাম ফজলুর রহমান খান। আমার মা-বাবা সৎ মানুষ ছিলেন। জীবনে সৎ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক হলে সৎভাবে জীবনযাপন করতে পারব, ডাক্তারি পড়ার ক্ষেত্রে এটিও একটি বিষয় ছিল।
আমি লেখাপড়া করেছি মিশনারি স্কুলে। সেন্ট আলফ্রেড উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। লেখাপড়া সেখানে খুব উচ্চমানের ছিল তা নয়, তবে চরিত্র গঠনের ওপর ওখানে বিশেষ জোর দেওয়া হতো। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করি। এর পর ঢাকা কলেজে এসে ভর্তি হই।
আমার মুখস্থবিদ্যা কম
ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ভাবতাম, কীভাবে আমি আমাকে সাহায্য করতে পারি? চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম থেকেই আমার মনটা অনুসন্ধিৎসু ছিল। আমার মুখস্থবিদ্যা কম, যেকোনো বিষয় বিশ্লেষণ করা বেশি পছন্দ। ১৯৬৫ সালে ফার্মাকোলজি এবং ফরেনসিক মেডিসিনে অনার্স নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করি। ১৯৭০ সালে এফসিপিএসে (পাকিস্তান) প্রথম স্থান অধিকার করার জন্য কর্নেল জাফরি গোল্ড মেডেল পাই। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. ফিল ডিগ্রি লাভ করি। অক্সফোর্ডে সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনে একটা মাইলস্টোন।
সহপাঠীদের দেখলে ভয় লাগত
বন্ধুরা মিলে শীতকালে ফুটবল খেলতাম, জাম্বুরা দিয়ে। কাঁচা জাম্বুরা গরম পানির মধ্যে ভিজিয়ে রাখলে সহজে ফাটত না। সেটা দিয়ে ফুটবল খেলতাম। এ ছাড়া ডাঙ্গুলি খেলতাম। আমার বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার। আমার জীবন খুব সাদামাটা ছিল।
আমি সব সময় স্কুলে প্রথম হয়েছি। তার কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, সেখানে তেমন প্রতিযোগিতা ছিল না। সবাই সাধারণ মানুষ ছিল। ঢাকা কলেজে আসার পর সহপাঠীদের দেখলে ভয় লাগত। মনে হতো ওরা আমার চেয়ে জ্ঞান রাখে বেশি। তবে পরে বুঝলাম, তাদের জ্ঞান আমার চেয়ে বেশি নয়।
অক্সফোর্ড থেকে অনেক শিখেছি
চিকিৎসাবিজ্ঞানের লোকেরা গবেষণা করবে, এটা দরকার। যখন অক্সফোর্ডে ছিলাম, অনেক কিছু করতাম। অক্সফোর্ডে গিয়ে এমন শিক্ষকদের দেখেছি, যাঁদের কথা ইন্টারমিডিয়েট থেকে জেনেছি। তাঁদের দেখে অবাক হয়ে যেতাম!
অক্সফোর্ডে পড়া শেষ হলো। সিডনি চার্লস ট্রুলাভ ছিলেন আমাদের সুপারভাইজার। সিডনি জিজ্ঞেস করলেন, অক্সফোর্ড থেকে কী কী শিখেছ? ভয়ে ঘাম বেরিয়ে গেল। আমি বললাম, ‘মনে হতো বিজ্ঞানীরা অন্য জগতের মানুষ। পরে বুঝলাম, তাঁরা আমাদের মতোই লোক।’
আমাদের গবেষণার সংস্কৃতি নেই
ব্যর্থতা নেই এমন কোনো লোক নেই। আর জীবনে যার ভেতর চ্যালেঞ্জ না থাকে, সে কি কিছু অর্জন করতে পারে?
আমাদের চিকিৎসকদের মধ্যে গবেষণার সংস্কৃতি নেই। আমরা তাদের জ্ঞানপিপাসু করে তুলতে পারিনি। এটা একটা ব্যর্থতা। আমি চেষ্টা করেছি। হয়তো সীমাবদ্ধতা ছিল।
অধ্যাপকরা পড়াবে, গবেষণা করবে; কিন্তু এটা হচ্ছে না। তারা প্রাইভেট রোগী দেখে, প্র্যাকটিস করে। গবেষণা কম করে। তবে আমার মনে হয়, এই গবেষণা করার বিষয়টা বারডেমে কিছুটা শুরু করতে পেরেছি। জীবনে সবকিছু ব্যর্থ হয়নি। অক্সফোর্ড আমাকে গবেষণা করার জন্য রেখে দিতে চেয়েছিল। তবে সব সময় চেয়েছি দেশে ফিরব।
অধ্যাপক ইব্রাহিমের মতো মানুষ দুর্লভ
বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ইব্রাহিম অসাধারণ মানুষ ছিলেন। এ রকম মানুষ খুবই দুর্লভ। আমি তাঁর জামাতা। আমার স্ত্রীর বড় বোন আমার ক্লাসমেট ছিল। আমাদের যখন বিয়ে হয়, তার আগে আমি তাদের জানালাম, এই বিয়েটা অসম্ভব। কেননা, তাদের সঙ্গে আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেক তফাৎ। পরে বিয়ে হয়। আমার স্ত্রী অধ্যাপক কিশোয়ারা আজাদ। ফারুক আজম খান ও ফয়েজ আসীফ খান আমার দুই ছেলে।
সব পেশাতেই নীতি থাকা জরুরি
সব পেশাতেই নীতি থাকাটা খুব জরুরি। চিকিৎসাপেশা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে। এটি ব্যবসা নয়। আমি বই পড়ি, গান শুনতে ভালোবাসি। কী করে মানুষকে ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ার দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে কাজ করি। মানুষের জীবনটা বোঝা হয়ে যাবে, যদি সেটা অন্যের কোনো কাজে না আসে। সোশ্যাল ক্যাপিটাল তৈরি করতে হবে।